সাতক্ষীরায় মাদকসহ দুই পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার: দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস
- আপডেট সময় : ০৭:৪৯:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
সাতক্ষীরায় মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযানে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা ঘটেছে। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে গিয়ে স্বয়ং পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন খোদ দুই পুলিশ সদস্য। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি চৌকস দল সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বকচরা বাইপাস সংলগ্ন এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যসহ মো. মোস্তাইন বিল্লাহ (৩০) ও নাজমুল (২৮) নামের দুই পুলিশ কর্মীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে। গত সোমবার বিকেলে এই ঘটনা ঘটে এবং মঙ্গলবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেপ্তারকৃত মোস্তাইন বিল্লাহ জেলা পুলিশের স্টাফ ফোর্স (এসএফ) শাখায় কর্মরত ছিলেন এবং এর আগে তিনি জেলা ডিবি পুলিশেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অপর আসামি নাজমুল জেলা পুলিশের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই ঘটনায় ডিবির একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে সদর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন এবং ডিবির উপপরিদর্শক সরোয়ার হোসেনকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি জানতে পারে যে বকচরা বাইপাস সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানের সামনে পাকা রাস্তায় কয়েকজন মাদক কারবারী মাদক কেনাবেচার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে গত সোমবার বেলা তিনটার দিকে সেখানে আকস্মিক অভিযান চালায় ডিবি দল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে একটি নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মোস্তাইন ও নাজমুল। তবে সতর্ক গোয়েন্দা পুলিশ দ্রুত তাঁদের ধাওয়া করে আটক করতে সক্ষম হয়। এ সময় মোস্তাইন বিল্লাহর ট্রাউজারের পকেট থেকে ১০০ মিলিলিটারের দুটি উইনসেরেক্স সিরাপ এবং একটি প্লাস্টিক ব্যাগ তল্লাশি করে আরও ৫৪ বোতল মাদক জব্দ করা হয়। জব্দকৃত বোতলগুলোতে ‘কোডিন ফসফেট অ্যান্ড ট্রাইপ্রোলিডিন হাইড্রোক্লোরাইড সিরাপ’ লেখা ছিল, যা মূলত ফেনসিডিলের বিকল্প বা সমগোত্রীয় মাদক হিসেবে চোরাকারবারিরা ব্যবহার করে থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর খুলনার পরিদর্শক হাওলাদার মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, উইনসেরেক্স সিরাপটি মূলত ফেনসিডিলের মতোই মাদক হিসেবে কাজ করে। ফেনসিডিলে যে ক্ষতিকর কোডিন ফসফেট নামক উপাদান থাকে, উইনসেরেক্সেও হুবহু একই উপাদান রয়েছে। শুধুমাত্র ব্র্যান্ডের নাম বা মোড়ক পরিবর্তন করে এই মাদকটি বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়ে থাকে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য স্বীকার করেছেন যে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পরস্পর যোগসাজশে এই অবৈধ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। পুলিশ বাহিনীর ভেতরে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে মাদক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল। অভিযানে তাঁদের ব্যবহৃত নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলটি ছাড়াও দুটি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়েছে, যেগুলোর কল রেকর্ড ও চ্যাট লিস্ট বিশ্লেষণ করে চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হয়েও এমন গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সুশীল সমাজ। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সাধারণ মানুষ যাঁদের কাছে নিজেদের নিরাপত্তার প্রত্যাশা করে এবং অপরাধের তথ্য দেয়, তাঁরাই যদি সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তবে জনগণের আস্থার জায়গাটি ভেঙে পড়ে। তিনি অবিলম্বে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি সাতক্ষীরা জেলায় কর্মরত সকল পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্ট করানোর জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি কঠোর বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। তাঁদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। পুলিশ বাহিনীতে কোনো ধরনের দুর্নীতিবাজ বা অপরাধীর ঠাঁই নেই উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে অপরাধী যেই হোক না কেন, কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। এই ঘটনার পর পুরো সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ বিভাগে চরম অস্বস্তি ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।

















