ঢাকা ০৫:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কলাপাড়া সাংবাদিক ফোরামের নতুন কমিটি গঠন: সভাপতি ইউসুফ, সম্পাদক ইলিয়াস জাবেদ কলাপাড়া ধানখালী ডিগ্রি কলেজ শিক্ষক কর্তৃক অধ্যক্ষের কক্ষে তালা, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত: সরকারি কাজে বাধা প্রদানের দায়ে অধ্যক্ষের মামলা। কলাপাড়ায় আগামীকাল শুরু হবে রাখাইন মহাথেরোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা কলাপাড়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন ‘আমি আপনাদের সেবক, আপনাদের কর্মচারী’-এবিএম মোশাররফ হোসেন এমপি   কালবৈশাখী তান্ডবে অসংখ্য ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, বিভিন্ন এলাকায় রাত থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন সজল গাইন বার কাউন্সিলে পরিক্ষায় উত্তীর্ণ। অনৈতিক ভিডিও ভাইরলের ঘটনায় খেপুপাড়া  বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বরখাস্ত কলাপাড়ায় এ্যাডভোকেট রুবেলের দাফন সম্পন্ন: বিভিন্ন মহলের শোক

চিংগরিয়া খাল পুনরুদ্ধারে বেলার উদ্যোগ — আদালতের রুল জারি, মাঠে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী):
  • আপডেট সময় : ০২:৪৪:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩৪ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌরসভার প্রাণপ্রবাহ চিংগরিয়া খাল দখল, ভরাট ও শ্রেণি পরিবর্তনের ঘটনায় এখন চলছে আইনি ও সামাজিক আন্দোলন। আদালতের রুল জারির পর মাঠ পর্যায়ে পরিবেশ সংগঠন ‘বেলা’ স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের অংশগ্রহণে শুরু করেছে সচেতনতা ও সমন্বয় কার্যক্রম।

কলাপাড়া উপজেলা ভূমি অফিস খাল হিসেবে রেকর্ডভুক্ত জমিকে ‘নাল’ শ্রেণিতে পরিবর্তন করে কয়েকটি সেটেলমেন্ট কেসের (৮২-কে/৮০-৮১, ৯০-কে/৮৬-৮৭, ৭৭৯-কে/৮৬-৮৭ ও ৭৭৭-কে/৮৬-৮৭) মাধ্যমে ব্যক্তি বিশেষকে বন্দোবস্ত প্রদান করে। পরবর্তীতে বন্দোবস্তুগ্রহীতারা খালের উপর বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ ও স্থাপনা নির্মাণ করেন। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং কলাপাড়া পৌর এলাকা ও আশপাশে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

স্থানভেদে ৪০ থেকে ৬০ ফুট প্রশস্ত খালটি এখন ১০ থেকে ২০ ফুটে নেমে এসেছে। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতায় শত শত একর জমি অনাবাদী হয়ে পড়ছে, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং পৌরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ছে।

বেলার আইনি উদ্যোগে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এলাকাবাসীর আবেদনের ভিত্তিতে ২০২৩ সালে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা দায়ের করে (রিট পিটিশন নং ১৪৭২৯/২০২৩)।
৩ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ খালটির বন্দোবস্ত বাতিলের অগ্রগতি বিষয়ে ছয় মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, কেন ৫.৪৬ একর খালভূমি উদ্ধারের উদ্যোগ না নেওয়া এবং খালকে ‘নাল’ শ্রেণিতে রূপান্তর করা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না।

স্থানীয় আন্দোলন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে বেলার সহায়তায় স্থানীয় সচেতন মহল দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও সমাবেশ করে আসছে। আন্দোলনের প্রভাবে সম্প্রতি উপজেলা ভূমি অফিস খালের কিছু অংশে নির্মিত মাটির বাঁধ কেটে দেয়ায় পানির প্রবাহ অনেকটা ফিরে এসেছে।

তবে এলাকাবাসী খালের সম্পূর্ণ উন্মুক্তকরণ, লীজ বাতিল এবং উৎসমুখে উপযুক্ত সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবিসমূহ:

১️/ চিংগরিয়া খালসহ সকল খালের লীজ বাতিল করতে হবে।
২️/ খালের সীমানা নির্ধারণ করে বাঁধ ও স্থাপনা অপসারণের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৩️/ নাব্যতা রক্ষায় খাল খনন ও দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে।
৪️/ খালের দুই পাড়ে সরকারিভাবে বনায়ন ও দেশীয় প্রজাতির মৎস্য চাষের উদ্যোগ নিতে হবে।
৫️/ কৃষি ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থে পর্যাপ্ত ব্লুইসগেইট নির্মাণ করে তা কৃষকদের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে।

এতে উপকারভোগী সমন্বয় সভা চিংগরিয়া খাল বিষয়ে চলমান সমস্যার আলোকে ২২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে উপজেলা সম্মেলন কক্ষে বেলার আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় চিংগরিয়া খালের বিরাজমান পরিস্থিতি বিষয়ক উপকারভোগী সমন্বয় সভা।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব কাউছার হামিদ, সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বেলা’র নেট সদস্য জনাব মেজবাহ উদ্দিন মান্নু।
সভায় বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী জনাব লিঙ্কন বায়েন স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

প্রশাসন ও পরিবেশবিদদের বক্তব্যে সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব কাউছার হামিদ বলেন,
আমরা সরকারি চাকরি করি—আইনের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারি না। সাধারণ নাগরিক থেকে প্রশাসন—সবাই আদালতের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য। অনেক সময় দেখা যায় নদীকে খাল, আর খালকে নাল দেখিয়ে সরকারি জমি কেউ কেউ দখল করে নিচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

পরিবেশবিদ মেজবাহ উদ্দিন মান্নু বলেন, পৌরবাসী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। প্রথমে সব খাল চিহ্নিত করতে হবে, এরপর দখলদারদের উচ্ছেদে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

বেলার পক্ষ থেকে জানানো হয়, খাল দখল ও শ্রেণি পরিবর্তন করে লীজ দেওয়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ভূমি ব্যবস্থাপনা বিধি ও সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে তারা আইনি সহায়তা ও মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

চিংগরিয়া খাল পুনরুদ্ধারে বেলার উদ্যোগ — আদালতের রুল জারি, মাঠে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু

আপডেট সময় : ০২:৪৪:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫

পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌরসভার প্রাণপ্রবাহ চিংগরিয়া খাল দখল, ভরাট ও শ্রেণি পরিবর্তনের ঘটনায় এখন চলছে আইনি ও সামাজিক আন্দোলন। আদালতের রুল জারির পর মাঠ পর্যায়ে পরিবেশ সংগঠন ‘বেলা’ স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের অংশগ্রহণে শুরু করেছে সচেতনতা ও সমন্বয় কার্যক্রম।

কলাপাড়া উপজেলা ভূমি অফিস খাল হিসেবে রেকর্ডভুক্ত জমিকে ‘নাল’ শ্রেণিতে পরিবর্তন করে কয়েকটি সেটেলমেন্ট কেসের (৮২-কে/৮০-৮১, ৯০-কে/৮৬-৮৭, ৭৭৯-কে/৮৬-৮৭ ও ৭৭৭-কে/৮৬-৮৭) মাধ্যমে ব্যক্তি বিশেষকে বন্দোবস্ত প্রদান করে। পরবর্তীতে বন্দোবস্তুগ্রহীতারা খালের উপর বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ ও স্থাপনা নির্মাণ করেন। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং কলাপাড়া পৌর এলাকা ও আশপাশে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

স্থানভেদে ৪০ থেকে ৬০ ফুট প্রশস্ত খালটি এখন ১০ থেকে ২০ ফুটে নেমে এসেছে। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতায় শত শত একর জমি অনাবাদী হয়ে পড়ছে, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং পৌরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ছে।

বেলার আইনি উদ্যোগে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এলাকাবাসীর আবেদনের ভিত্তিতে ২০২৩ সালে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা দায়ের করে (রিট পিটিশন নং ১৪৭২৯/২০২৩)।
৩ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ খালটির বন্দোবস্ত বাতিলের অগ্রগতি বিষয়ে ছয় মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, কেন ৫.৪৬ একর খালভূমি উদ্ধারের উদ্যোগ না নেওয়া এবং খালকে ‘নাল’ শ্রেণিতে রূপান্তর করা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না।

স্থানীয় আন্দোলন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে বেলার সহায়তায় স্থানীয় সচেতন মহল দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও সমাবেশ করে আসছে। আন্দোলনের প্রভাবে সম্প্রতি উপজেলা ভূমি অফিস খালের কিছু অংশে নির্মিত মাটির বাঁধ কেটে দেয়ায় পানির প্রবাহ অনেকটা ফিরে এসেছে।

তবে এলাকাবাসী খালের সম্পূর্ণ উন্মুক্তকরণ, লীজ বাতিল এবং উৎসমুখে উপযুক্ত সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবিসমূহ:

১️/ চিংগরিয়া খালসহ সকল খালের লীজ বাতিল করতে হবে।
২️/ খালের সীমানা নির্ধারণ করে বাঁধ ও স্থাপনা অপসারণের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৩️/ নাব্যতা রক্ষায় খাল খনন ও দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে।
৪️/ খালের দুই পাড়ে সরকারিভাবে বনায়ন ও দেশীয় প্রজাতির মৎস্য চাষের উদ্যোগ নিতে হবে।
৫️/ কৃষি ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থে পর্যাপ্ত ব্লুইসগেইট নির্মাণ করে তা কৃষকদের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে।

এতে উপকারভোগী সমন্বয় সভা চিংগরিয়া খাল বিষয়ে চলমান সমস্যার আলোকে ২২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে উপজেলা সম্মেলন কক্ষে বেলার আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় চিংগরিয়া খালের বিরাজমান পরিস্থিতি বিষয়ক উপকারভোগী সমন্বয় সভা।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব কাউছার হামিদ, সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বেলা’র নেট সদস্য জনাব মেজবাহ উদ্দিন মান্নু।
সভায় বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী জনাব লিঙ্কন বায়েন স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

প্রশাসন ও পরিবেশবিদদের বক্তব্যে সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব কাউছার হামিদ বলেন,
আমরা সরকারি চাকরি করি—আইনের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারি না। সাধারণ নাগরিক থেকে প্রশাসন—সবাই আদালতের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য। অনেক সময় দেখা যায় নদীকে খাল, আর খালকে নাল দেখিয়ে সরকারি জমি কেউ কেউ দখল করে নিচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

পরিবেশবিদ মেজবাহ উদ্দিন মান্নু বলেন, পৌরবাসী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। প্রথমে সব খাল চিহ্নিত করতে হবে, এরপর দখলদারদের উচ্ছেদে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

বেলার পক্ষ থেকে জানানো হয়, খাল দখল ও শ্রেণি পরিবর্তন করে লীজ দেওয়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ভূমি ব্যবস্থাপনা বিধি ও সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে তারা আইনি সহায়তা ও মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।